গণজাগরণ বনাম হেফাজত নয়, গণজাগরণ এবং হেফাজত

মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে জামায়াতে ইসলামী তাদের রক্ষা করতে সহিংসতা – অরাজকতা – চোরাগোপ্তা হামলা শুরু করে। কাদের মোল্লার রায়ে ফাঁসি না হয়ে যাবজ্জীবন হওয়ায় তরুণ সমাজ এবং দেশের জনগণ ধারণা করে, জামায়াতে ইসলামীর সহিংসতায় ভীত সরকার এই রায় দিয়েছে। রায়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ জানাতে ফেব্রুয়ারি মাসে তরুণ সমাজের ডাকে শাহবাগে জমায়েত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জনগণ – সৃষ্টি হয় গণজাগরণ মঞ্চ

আওয়ামী লীগ গণজাগরণ মঞ্চ থেকে মানবতাবিরধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সাহস সঞ্চয় করেই থেমে থাকেনি, কিছুদিনের জন্য যতটা সম্ভব মূল মঞ্চের দখলও নেয়। এসময় তারা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে “রাজাকার” বলার মত নিন্দনীয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজ করে। ঘটনা পরম্পরা বিবেচনা করলে আমরা দেখি, মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তারই কিছুদিন আগে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ‘৭১ এ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

জামায়াতে ইসলামী এসময় তাদের নেতাদের রক্ষা করতে সহিংসতার পাশাপাশি গুজব রটনার আশ্রয়ও নেয়। হঠাত চাঁদে দেখা যায় জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদিকে! মক্কা শরিফের গেলাপেও নানা অবিশ্বাস্য ব্যাপার দেখা দেয়! (একজন মুসলিম কিভাবে নিজের ধর্ম নিয়ে এধরনের রটনা রটাতে পারেন – তা কেবল তিনিই জানেন।) গ্রামে মসজিদের ইমামকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মসজিদের মাইকে এমন গুজব রটিয়ে জনগণকে নিয়ে হামলা চালায়। সনাতনী ধর্মাবলম্বীরাও তাদের হামলার শিকার হন।

গণজাগরণ মঞ্চ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি বন্ধ করতে জামায়াত গুজব রটায় – গণজাগরণ মঞ্চের সব ব্লগার নাস্তিক। তারা ইসলামী চেতনা ধ্বংস করছে।

আমরা জানি, দেশের কিছু তরুণ ধর্ম নিয়ে ব্লগে আপত্তিকর কথা লিখেছিল। তাদের এই কাজ নিন্দনীয়। পৃথিবীর কোন ব্যক্তি নিজেকে সবজান্তা ভাবার ধৃষ্টতা দেখাতে পারেন না। সীমিত জ্ঞান দিয়ে ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর লেখা প্রকাশ করে কারো ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেওয়া, সহিংসতার পরিবেশ সৃষ্টি করা সঠিক নয়।

তবে তাই বলে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে শাহবাগের সমস্ত ব্লগারকে নাস্তিক আখ্যা দেওয়াটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ব্লগার শব্দটিই হয়ে ওঠে নাস্তিক্যবাদের প্রতিশব্দ।

গণজাগরণ মঞ্চের কিছু তরুণের দুই একটি শ্লোগান হয়ত আবেগের বাড়াবাড়ি প্রকাশ ছিল, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতেই হবে – এ নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করার কোন অবকাশ নেই।

আমরা প্রত্যাশা করবো, যেসব তরুণদের ভুল বুঝিয়ে ভুল পথ দেখানো হচ্ছে, স্বাধীনতার সময়ে যাদের জন্মই হয়নি, আমাদের নতুন প্রজন্মের স্বপ্নযোদ্ধারা তাদেরও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবে।

পাশাপাশি আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে “জয় বাংলা”র সাথে “জয় বাংলাদেশ” শুনতে চাই। আমাদের এখন স্বাধীন একটা দেশ আছে – বাংলাদেশ। শ্লোগানটি যে সময়কার – তখন ছিল না। “জয় বাংলা” শ্লোগানটি বেশ পুরনো – ৭১ এর আগের – যখন “বাংলা” ঠিক “দেশ” হয়ে ওঠেনি। “জয় বাংলা” শ্লোগানটির গুরুত্ব এখানেই যে এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার আবেগকে ধারণ করে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ৭১ এ ফিরিয়ে নিয়ে যায় (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, “জয় বাংলা, বাংলার জয়”)। ৭১ এর আগে পূর্ব পাকিস্তান না বলে “বাংলা” বলতেই আমরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম।

আমাদের দেশের সাধারণত সবচেয়ে অসহায়, এতিম সন্তানরা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। (বেতিক্রম অবশ্যই আছে – অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানকেও ইসলামী শিক্ষা দেওয়ার জন্য মাদ্রাসায় পাঠান হয়।) এই অসহায় এতিম ছাত্ররা অবহেলিত। এদের হয়ে কথা বলার মত কেউ নেই। কাজেই জামায়াতে ইসলামী যখন যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্যে শাহবাগের আন্দোলন বন্ধ করতে তাদের কাজে লাগাতে চায়, অসহায় অবহেলিত মাদ্রাসা ছাত্ররা তখন রাস্তায় নেমে পড়ে। গড়ে ওঠে আরেকটি আন্দোলন।

ইন্টারনেট এর মাধ্যমে সারা পৃথিবীর সমস্ত তথ্য, সমস্ত জ্ঞান আমাদের হাতের মুঠোয়। ইন্টারনেটের আরেকটি ভাল ব্যাপার হল – যে কেউ এই মাধ্যমে নিজের লেখা প্রকাশ করতে পারে এবং সারা পৃথিবীর মানুষ সেই লেখা পড়তে পারে। যারা নিজের লেখা ইন্টারনেটে প্রকাশ করেন তাদের বলা হয় ব্লগার।

“ব্লগার” শব্দটির সাথে নাস্তিক্যবাদের কোন সম্পর্ক নেই।

মানবতাবিরধী অপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে শাহবাগের আন্দোলন বন্ধ করার দরকার ছিল। জামায়াত শিবির শাহবাগের আন্দোলন বন্ধ করতে উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে পত্রিকায় বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন করে এবং শাহবাগের সমস্ত আন্দোলনকারী সম্পর্কে বানোয়াট কথা প্রচার করে মাদ্রাসা ছাত্রদের আন্দোলনে নামিয়েছে। পাশাপাশি, ব্লগার শব্দটির সাথে নাস্তিক্যবাদকে জুড়িয়ে দিয়েছে। 

হাদিসে আছে – “বিদ্বানের কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও বেশি পবিত্র”।

আমরা প্রত্যাশা করব – আমাদের দেশের মাদ্রাসার বিদ্বান ছাত্ররা ইসলামের কথা, নিজেদের গ্রামের বিভিন্ন সমস্যার কথা, তথা জ্ঞান বিজ্ঞানের কথা এযুগের মাধ্যম ইন্টারনেটে প্রকাশ করবেন এবং ব্লগার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। তাদের এই লেখা থাকবে সারা পৃথিবীর জন্য উন্মুক্ত। কারো কারো লেখা হয়ত দেশ বিদেশের লক্ষ মানুষ পড়বেন।

আমাদের একের সাথে অন্যের যে মত পার্থক্য রয়েছে, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে তার সমাধান হবে ব্লগে আলোচনা, যুক্তি-পাল্টা যুক্তির মাধ্যমে। ব্লগ হয়ে উঠতে পারে জ্ঞান চর্চার একটা মাধ্যম।

আর এভাবেই আমরা ভুল বুঝে নিজেরা নিজেদের মাঝে যে দূরত্ব তৈরি করেছিলাম, তার অবসান ঘটবে।
সবাই মিলে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে ভরপুর একটা পৃথিবী গড়ব।

আরও

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s