বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুনগত পরিবর্তনের গল্প – ১ [আমি রাজনীতিতে কিভাবে – ২]

১.

৯১ এর নির্বাচনের সময় আমি ছিলাম অনেক ছোট – রীতিমত ৪ বছরের বাচ্চা ছেলে!খুব একটা না বুঝলেও এটুকু বুঝতাম আমি ধানের শিষের সাপোরটার। আর মামা ছিলেন নৌকার সাপোরটার। আমাকে মজা করে বলতেন, ধানের শীষ ডুবে যাবে।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য মামার নৌকাই ডুবল!

মানুষ কারও না কারও পক্ষে ভোট দেয় এবং ভোট যার পক্ষে বেশি পড়ে সে জিতে – ইলেকশান কিভাবে হয় এটা চিন্তা করে বুঝেছিলাম আরও কিছুদিন পরে। আব্বুকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিলাম আমার ধারণা ঠিক কিনা।

মাঝখানে ৪ বছর সৌদি আরবে কাটিয়ে ‘৯৭ এর ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসি।

পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ত আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসের খবর – এক এক নেতা এক এক এলাকায় (ফেনী, লক্ষ্মীপুর) সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। আবার কারও কারও ব্যাংক থেকে ঋণ খেলাপির খবর। #TowardsCrimeFreeBangladesh

২০০১ এর সময় আমি পড়তাম ক্লাস নাইনে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরো সময়টা ভালমত ফলো করলাম। নির্বাচন ও হল।

এরপর থেকে পত্রিকা খুললেই দেখি দুর্নীতি আর অনিয়মের খবর। যোগ্য ব্যক্তিরা সরকারে মূল্যায়ন পেলেন না।

বুঝলাম, এভাবে দেশ চলতে পারে না। পরিবর্তন আসতেই হবে।

২.

২০০৩ সাল থেকে অধ্যাপক ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং ডঃ কামাল হোসেন পরিবর্তনের কথা বললেন।

বিকল্প ধারা আর গণফোরামের খবরগুলো পত্রিকাতে খুঁজে বের করতাম। কী গভীরভাবে চাইতাম বাংলাদেশের “পচা” রাজনীতিতে গুনগত পরিবর্তন আসুক!

দুই নেতার নেতৃত্বাধীন দুই দল মিলে সারা দেশে জনগণের বক্তব্য শোনার অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। চমৎকার একটা ব্যাপার। এখনকার মত এত চ্যানেল, এত অনুষ্ঠান তখন ছিল না। কাজেই রাজনৈতিক সমাবেশে সাধারণত নেতাদের বক্তব্য শুনেই ফিরে যেতে হয়। এমন একটা সময়ে এই ধরণের অনুষ্ঠান প্রশংসনীয়। চট্টগ্রামের অনুষ্ঠানে আমিও গিয়েছিলাম – জীবনে প্রথমবারের মত কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে!

মানুষ নিজের চাওয়া পাওয়া জানাতে চায়। আগ্রহ নিয়ে তাদের কথা শুনলে তারা কত খুশি হয়!

বিএনপি সরকারের কর্মীরা এসব অনুষ্ঠানে ডিম ছুড়ে মারাসহ ব্যাপকভাবে দমন চালিয়ে দুই দলের যে সম্ভাবনা ছিল তাকে থামিয়ে দিল।

৩.

২০০৭ সালে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ডঃ মুহম্মদ ইউনুস পরিবর্তনের ডাক দিলেন।

একটা রাজনৈতিক দল গঠন করবেন। মিডিয়ার মাধ্যমে পরিকল্পনা জানিয়ে জনগণের মতামত চাইলেন।

এবার আশা ছিল, পরিবর্তন আসবেই। পরিছন্ন ভাবমূর্তি, প্রশ্নাতীত সততা, মেধা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশের সমর্থন, গ্রামীণ ব্যাংকের সারাদেশে লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে পরিচিতি, তরুণ প্রজন্মের আইডল – বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।

কিন্তু এবারও আগের কাহিনী – আরও ব্যাপকভাবে।

বিকল্প ধারা – গণফোরামের উপর বিএনপি এককভাবে দমন চালিয়েছিল। ২০০৬ তে অধ্যাপক ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং কর্নেল (অবঃ) ডঃ অলি আহমেদ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠনের পরপরও বিএনপি দ্রুত দমনের পথে গিয়েছিল। আরও আগে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আলাদা হওয়ার পর আওয়ামী লীগ দমন (খুনসহ) চালিয়েছিল।

এবার দুই দল সম্মিলিতভাবে তাদের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে দমনের পথে গেল। মিথ্যা এবং আপত্তিকর নানা শব্দও  ব্যবহার করল (যেমন “ঘুষখোর”; যিনি সামাজিক ব্যবসা নামে এমন ব্যবসা চালু করেছেন যেখান থেকে মালিক শুধুমাত্র প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলে নেওয়া ছাড়া কোন লভ্যাংশ নেবেন না, যার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের ৯৭ শতাংশ মালিকানা গরিব মহিলাদের হাতে এমন আদর্শ ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্য এসব শব্দ!)।  

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ যে পরিবর্তন চাইছিল ২০০৭ এও তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হল।

৪.

এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রশংসনীয় নানা উদ্যোগে সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম।

এমন একটা দেশ – সারাদেশের মানুষের কোন জাতীয় পরিচয়পত্র, ডেটাবেইসে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই! ছবিযুক্ত ভোটার আইডি কার্ডের মাধ্যমে আমরা তা পেলাম।

বিচার বিভাগেও প্রয়োজনীয় সংস্কার এল।

শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি বাংলাদেশের অনেকদিনের অভাব একটা শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশনও পেলাম।

দুর্নীতিবাজ নেতাদের গ্রেপ্তার দেখে স্বস্তি ফিরে এলো। বাংলাদেশের জনগণের মাঝে অনেক জনপ্রিয়তা পেলো।

দুর্নীতিতে বিশ্বসেরার খেতাব জেতা বাংলাদেশে একটা নতুন যুগের সূচনা হল বলে বাংলাদেশের জনগণ আশা করল।

৫.

এরপর ২০০৮ এর নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলো।

নতুন মন্ত্রিসভার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অনেকে প্রশংসা করলেন। প্রথম ১ বছরে মনে হল, ছাত্রলীগ আর যুবলীগের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবাজদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের আশা দেখেছিলাম তা দীর্ঘস্থায়ী হবে। এসময়কার সার্ভেই ও তাই বলে – প্রথম বছরে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়ে গিয়েছিল।

এরপরই আমাদের সামনে প্রকাশিত হওয়া শুরু করল দুর্নীতি, সন্ত্রাস আর অনিয়মের মহোৎসবের খবর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের যে আশা করেছিলাম – এবার সে আশায় গুড়ে বালি – কয়েক বছরের জন্য হলেও।

৬.

অবশেষে ২০১৩ সালের শেষ তিন মাসে আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সত্যি সত্যিই নতুন সূর্যের উদয়ের পথে এগুনোর লক্ষ্যে একত্রিত হলাম। অন্যায় অবিচার দুর্নীতি মুক্ত একটা সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন আমাদের একত্রিত করল।

পরবর্তী: সম্মিলিতভাবে সবাই জনগণের সামনে আসবেন।

এবার আমরা জনগনকে সাথে নিয়েই সামনে আসবো। কারণ আমরা জানি, জনগণের ঐক্যের শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি।

আরও

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s