একবিংশ শতাব্দীতে প্রাযুক্তিক বিপ্লব

ভবিষ্যতের বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নিয়ে আমার সবসময়ই আগ্রহ। অনেক বছর আগে (২০০৬ এর দিকে) “Future Science”, “Future Technology”, “Future Artificial Intelligence Technology” Google করতে গিয়ে চোখে পড়ে  Ray Kurzweil [1] এর লেখা। তার লেখা আমাকে প্রচন্ডরকম অনুপ্রাণিত করেছিল। লেখাগুলো থেকে প্রথম জানি Exponential Technologies সম্পর্কে। 


আমি ব্যবহার করতাম ধীরগতির ইন্টারনেট। কিন্তু গভীর আগ্রহ নিয়ে এক একটা পেইজ লোড হওয়ার জন্য অপেক্ষা করাতেও ছিল আনন্দ!

২০০৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজের ‘০৫ ব্যাচের রিইউনিয়ান উপলক্ষে প্রকাশিত ম্যাগাজিনে ভবিষ্যত প্রযুক্তি নিয়ে আমার নিচের লেখাটা প্রকাশিত হয়। ২০০৮ এর কোন এক সময় লেখা। তখনকার চাইতে জ্ঞানের পরিধি অনেক বেড়েছে। আশপাশের সবকিছু নিয়ে ভিউ ও অনেকখানি পাল্টেছে। তারপরও লেখাটা খুব প্রিয়! সামান্য পরিমার্জিত।



কেমন হবে যদি আশেপাশের বুদ্ধিমান যন্ত্রপাতিগুলোর সাথে যখন তখন আড্ডা জুড়ে দেওয়া যায়? কিংবা তোমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বেশিরভাগই হয় কৃত্রিম আর দেহের ভেতর ব্যস্তভাবে ঘুরে বেড়ায় খালি চোখে দেখা যায় না এমন সব ন্যানো রোবট? ভার্চুয়াল রিয়ালিটির জগতে কৃত্রিম সব অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকতেই বা কেমন লাগবে?

কি? শুনতে অবাস্তব মনে হচ্ছে?

আসলে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির কল্যাণে বাস্তবতা আর অবাস্তবতার সীমারেখাটি দিন দিন ম্লান থেকে ম্লানতর হচ্ছে। আমাদের চোখের সামনেই ঘটে চলেছে এক অভুতপূর্ব বিপ্লব। বায়োপ্রযুক্তি আমাদের দিচ্ছে প্রাণকে ব্যবহার, নিয়ন্ত্রন এবং উন্নত করার হাতিয়ার। তথ্যের সহজলভ্যতা বিশ্বকে বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত করছে। আর ন্যানোপ্রযুক্তি অভিনব সব পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পণ্যের কার্যক্ষমতাও বাড়িয়ে তুলছে।

এসব দেখে কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং লেখক ভারনার ভিঞ্জ প্রাযুক্তিক সিঙ্গুলারিটি(Technological Singularity) ধারণাটা প্রবর্তন করেছিলেন। [2] তার ভবিষ্যৎবাণীটা মূলত কম্পিউটার প্রযুক্তির অগ্রগতিকে ভিত্তি করেই। ধারণাটা এরকম – একবিংশ শতাব্দীর কোন এক সময় কম্পিউটারের বুদ্ধিমত্তা মানব বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে আর তারপর উন্নয়ন এত বেশি ত্বরান্বিত হবে (কম্পিউটার যেহেতু মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান কাজেই কম্পিউটারই সব আবিষ্কার করা শুরু করবে), যে এর সম্পর্কে ভবিষৎবাণী করা যাবে না।

বাস্তববাদীঃ কিন্তু আসলেই কি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভবিষৎবাণী করা যায়?


এই প্রশ্নের উত্তরে তাপগতিবিদ্যা থেকে একটা উদাহরণ দেওয়া যায়।

তাপগতিবিদ্যায় একটা ক্ষুদ্র গ্যাস অণু কোথায় যাবে, কত গতিতে যাবে, তা ভবিষৎবাণী করা প্রায় অসম্ভব – আরেকটা অণু এসে যে কোন সময় ধাক্কা দিতে পারে। কিন্তু লক্ষ কোটি অণুর সমন্বয়ে গঠিত গ্যাসের আচরণ, কিছু ধর্ম অনেকটাই ভবিষৎবাণীর যোগ্য। তা নাহলে গ্যাসের জন্য PV = nRT সূত্রটা আমরা পেতাম না। এখানে গ্যাসের তাপমাত্রা, চাপ আর আয়তন নিয়ে আমরা ভবিষ্যৎবাণী করতে পারি, কিন্তু কখনই একটা গ্যাস অণু নিয়ে আগাম কিছু নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব না।

একইভাবে, প্রযুক্তির কোন একটা ক্ষেত্র বা উপক্ষেত্র কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা কঠিন হলেও কোন কোন প্রযুক্তিবিদ মনে করেন, সবগুলো ক্ষেত্র উপক্ষেত্রের সম্মিলিত ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় মানব সমাজে প্রযুক্তির বিকাশ হয়ত ভবিষ্যৎবাণী যোগ্য।

ইনফরমেশান থিউরির প্রবক্তা ক্লড শানোন, পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং থেকে শুরু করে প্রায় সব খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, প্রকৌশলীই প্রাযুক্তিক বিপ্লবের নানা সম্ভাবনার কথা যুক্তি দিয়ে তুলে ধরেছেন। এদেরই একজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ রেই কুরযওয়েইল। ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এবং ঠিক কখন কোন প্রযুক্তি বাজারে আসবে তা নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। [3] তার যুক্তির ভিত্তি ইন্টেলের প্রতিষ্ঠাতা মুরের সূত্র। মুরের সূত্রানুসারে ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটে ট্রান্সিস্টার সংখ্যা প্রতি প্রায় দুবছরে দ্বিগুণ হচ্ছে। [4] অন্যভাবে বলা যায়, কম্পিউটারের বুদ্ধিমত্তার বৃদ্ধিহার এক্সপনেনশিয়াল (দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে), সরলরৈখিক না।


এক্সপনেনশিয়াল বৃদ্ধিহার ব্যাপারটা বোঝা দরকার।

ধরা যাক, একটা পুকুরে ফুল আছে ২টি।

প্রথমে ধরি, ফুলের সংখ্যা সরলরৈখিক হারে বাড়ছে – প্রতিদিন ২টি করে বাড়ছে। তাহলে ২য় দিনে ফুল হবে ৪টি, ৩য় দিনে ৬টি, এভাবে ১০ দিন পর ২০টি।

এবার ধরি, ফুলের সংখ্যা এক্সপনেনশিয়াল হারে বাড়ছে – প্রতিদিন দ্বিগুণ হচ্ছে। তাহলে ২য় দিনে ফুল হবে ৪টি, ৩য় দিনে ৮টি, ৪র্থ দিনে ১৬টি, এভাবে ১০ দিন পর ১০২৪টি।

কোথায় ২০ আর কোথায় ১০২৪।

এক্সপনেনশিয়াল হার চলতে থাকলে ২০ দিন পর ফুলের সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়াবে।

এক্সপনেনশিয়াল হারে কোন কিছু বাড়তে থাকলে পরিবর্তনটা কত দ্রুত হয় – বুঝতে পারছ? কম্পিউটারের ক্ষমতা বাড়ছে এক্সপনেনশিয়াল হারে। 
এখন কল্পনা কর, কম্পিউটারের ক্ষমতা যদি প্রতি দেড় থেকে দুই বছরে দ্বিগুণ হতে থাকে, তাহলে কত দ্রুত তা বাড়ছে। একারনেই মাত্র কয়েক বছর আগে ডেস্কটপ কম্পিউটারের যে ক্ষমতা ছিল, এখন হাতের তালুতে থাকা স্মার্ট ফোনের তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা।

কম্পিউটারের ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে যা ঘটেছে তা হল যেসব প্রযুক্তি কম্পিউটারনির্ভর ওগুলোও দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। অল্প সময়ে আধুনিক ইন্টারনেটের বিস্ফোরণ এর উদাহরণ। ৯০ দশকের মাঝামাঝি ওয়েব (Web) এর সূচনা – এর আগে সাধারণ জনগণের মাঝে ইন্টারনেটের প্রচলন ছিল না। আর এখন ইন্টারনেট ছাড়া জীবন আমরা কল্পনা করতে পারি? 

প্রযুক্তির অন্যান্য ক্ষেত্রেও আমরা এক্সপনেনশিয়াল উন্নতির প্রভাব দেখছি। যেমন এইচ.আই.ভি কে সিকয়েন্স করতে আমাদের যেখানে সময় লেগেছিল ১৫ বছর, সেখানে SARS কে সিকয়েন্স করতে সময় লেগেছে মাত্র ৩১ দিন।

পদার্থবিজ্ঞানীঃ কিন্তু এক্সপনেনশিয়াল উন্নতি তো অনির্দিষ্ট কাল ধরে চলতে পারে না। একটা পর্যায়ে মৌলিক বিজ্ঞানের সাথে সংঘর্ষ ঘটতে পারে। যেমন ট্রানজিস্টারের আকার কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুসারে একটা সীমা পর্যন্ত ছোট হতে পারে। এরপর?


মৌলিক বিজ্ঞানের সাথে সংঘর্ষে না গিয়ে এক্সপনেনশিয়াল উন্নতি কিভাবে চলবে তাও বলেছেন Kurzweil। তার মতে সীমায় পৌঁছানোর আগেই প্যারাডাইম পরিবর্তন হবে। অর্থাৎ, একই ধারায় উন্নতি না ঘটে সম্পূর্ণ নতুন একটা ধারার সূচনা হবে। যেমনটা হয়েছিল ভ্যাকুয়াম টিউব থেকে ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটে উত্তরণের সময়। এবার হয়ত ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট থেকে ত্রিমাত্রিক আণবিক কম্পিউটিং এ উত্তরণ ঘটবে।

তাহলে কথা না বাড়িয়ে দেখে আসা যাক ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি আমাদের জন্য কি কি নিয়ে অপেক্ষা করছে। প্রথমেই তাকানো যাক নিজের দিকে।

মানবদেহ ভার্সন ২.০

ছেলে মেয়ে দেখতে কখনই পুরোপুরি বাবা মায়ের মত হয় না। ভাই বোনরাও দেখতে একরকম হয় না। বাবামায়ের জীন রিকম্বিনেশান, মিউটেশানের মাধ্যমে পাল্টে সন্তানের কাছে যায়। আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মাতরে একটু একটু পাল্টে যাওয়ার প্রক্রিয়া বিবর্তনে (Biological Evolution) হাজার লক্ষ বছরের ফসল আমাদের এই দেহ।

বিবর্তনে আমাদের যোগ্যতর করে তোলার জন্য যে অসংখ্য অভিযোজন ঘটেছে তার একটা হল দেহে ক্যালরি জমা রাখার ব্যাপারটা – যাতে খাদ্যের প্রাচুর্যের পর ঘাটতি এলে ব্যবহার করা যায়। আমাদের পূর্ব পুরুষদের সবসময় খাওয়া জুটত না। কাজেই একবার খাওয়ার সন্ধান পেলে অনেকটুকু খেয়ে দেহে জমিয়ে রাখা দরকার ছিল। কিন্তু আজ এই জীববৈজ্ঞানিক কৌশল প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এটাই মূলত দায়ি স্থুলতা, করনারি আরটারি রোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের জন্য।

এটা শুধু একটা উদাহরণ। বিবর্তনের আরও অনেক প্রক্রিয়া আজ নতুন পৃথিবীতে আমাদের চাহিদার বিরুদ্ধে যাচ্ছে। তাই অনেক বিজ্ঞানী ভাবছেন দেহটিকে আধুনিক পৃথিবীর উপযোগী করে নতুনভাবে ডিজাইন করার সময় এসেছে। আমরা ইতিমধ্যে দেহের প্রাকৃতিক চক্রটিকে প্রভাবিত করছি ওষুধ দিয়ে, ডিভাইস দিয়ে প্রতিস্থাপন করছি অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে। জীব বিজ্ঞান, প্রাণ প্রকৌশল এবং ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা দেহের জন্য এমন সব সিস্টেম ডিজাইন করতে চাই যেগুলো হবে আরও দীর্ঘস্থায়ী, মজবুত, রোগ প্রতিরোধী এবং আনন্দদায়ক।

এক্ষেত্রে অন্যতম অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখতে হবে ন্যানোবোট বা রক্ত কোষ আকারের রোবটকে। শরীরের রোগ সারাবার জন্য ন্যানো বোট ক্ষুদ্র রোবট সার্জনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। ন্যানোবোটগুলো আমাদের সংবেদী অঙ্গগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টি করে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির কৃত্রিম সব অনুভূতির স্বাদ দেবে – এই স্বপ্ন কোন কোন বিজ্ঞানীর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। এখানেই শেষ না। ন্যানো মেডিসিন গবেষক রবার্ট ফ্রিটাস আমাদের লোহিত রক্ত কণিকাকে নতুনভাবে ডিজাইন করতে চান। তিনি এমনভাবে ডিজাইন করতে চান যাতে দেহে হৃদপিন্ডের প্রয়োজন কমে যায়। হৃদপিন্ড মূলত দেহে রক্ত পাম্প করার একটা জীব যন্ত্র। এমন লোহিত রক্ত কণিকা যদি ডিজাইন করা যায় যা নিজেই সারা দেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে তাহলে হৃদপিন্ডের প্রয়োজন কমে আসে।

স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা ক্ষেত্রটিকে এগিয়ে দিচ্ছে। স্টেম সেল হচ্ছে এমন কোষ যা বিভিন্ন অঙ্গ, টিস্যুর মাতৃকোষ হিসেবে কাজ করে। [5] কিডনির স্টেম সেল থেকে ধীরে ধীরে কিডনি গড়ে ওঠে। হৃদপিন্ডের স্টেম সেল পরিণত হয় সম্পূর্ণ হৃদপিন্ডে। আমরা স্টেম সেলকে পোষ মানানো শিখতে পারলে যে কোন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তৈরি করে নিতে পারবো। মোট কথা, একবিংশ শতাব্দীতে দেহের প্রায় সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে কৃত্রিম অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যাবে।

স্নায়ু বিজ্ঞানীঃ কিন্তু মস্তিষ্ককে প্রতিস্থাপিত করা তো সম্ভব না। মস্তিষ্ককে প্রতিস্থাপিত করলে একজন মানুষ অনুভন করতে পারবে না যে সে আগের মানুষটাই আছে। তাহলে? মানব সম্প্রদায়ের বুদ্ধিমত্তা কি সব সময় একই থাকবে?

মস্তিস্ক এবং বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারটি এখন আলোচিত হবে।


বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ও ভবিষ্যৎ

বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য সাফল্যে আধুনিক বিজ্ঞানী আর প্রকৌশলীরা মনে করেন, আধুনিক বিজ্ঞান মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু আমরা যারা স্বাধীনভাবে সব ধরণের জ্ঞান আহরণ করি, আমরা জানি মহাজগতে এমন অনেক কিছু আছে, যেগুলো এখনও আধুনিক বিজ্ঞানের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আধুনিক বিজ্ঞান বিশেষ করে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞানীরা সেসব বিবেচনা করলে বলবেন, বিজ্ঞানকে নতুন করে লিখতে হবে! আমার ব্যক্তিগত মতামত: আমরা ধীরে ধীরে আল্টিমেইট রিয়্যালিটি (“Ultimate Reality”) র সন্ধান পাবো। আধুনিক বিজ্ঞান সেই আল্টিমেইট রিয়্যালিটির একটা অংশ।

আধুনিক বিজ্ঞান অনুসারে মহাবিশ্বে মানুষ একটা অকিঞ্চিৎকর ব্যাপার। বিশাল একটা মহাবিশ্ব – লক্ষ কোটি গ্যালাক্সি নিয়ে গঠিত। তাদেরই একটা মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির সূর্য নামক নক্ষত্রের একটা গ্রহ পৃথিবীতে, যদিও সম্ভাবনা খুবই কম ছিল, কিন্তু বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের মত একটা প্রাণী সৃষ্টি হয়ে গেছে!

কিন্তু আমরা জেনেছি, পদার্থ এবং শক্তির বাইরে Consciousness বলে একটা ব্যাপার আছে, এবং সেই Consciousness এর এমন অনেক ক্ষমতা আছে, যেগুলো পদার্থ (Matter) আর শক্তি (Energy) দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। Consciousness কে বিবেচনায় নিলে আমরা বুঝতে পারি: আমরা, মানুষরা মোটেই অকিঞ্চিৎকর নই, বরং আমাদের কেন্দ্র করেই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব।


আধুনিক বিজ্ঞান মহাবিশ্বের বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করে এভাবেঃ

পদার্থবিজ্ঞানের অজানা সূত্রানুসারে যে মহাবিশ্বের সূচনা, পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নের সম্মিলিত ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় তার বিকাশ। এরপর ডিএনএ কিংবা আরএনএ র মাধ্যমে প্রাণের উদ্ভব। তারও অনেক কাল পরে প্রাণের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের জন্য মস্তিষ্কের উদ্ভব। মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটলে সেটি তৈরি করে প্রযুক্তি আর এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক সন্ধিক্ষণে। আমাদের অপেক্ষা প্রাণ ও প্রযুক্তির একীভূত হওয়া এবং উচ্চতর গঠনের জীবন ও বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টির জন্য। এই লক্ষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন যেটি মানুষের চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রযুক্তিকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে।

সমালোচকঃ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তো সেই কবে থেকেই আশার বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে। সত্যিকারের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমরা আদৌ পাবো?


আরও অনেকের মতই রেই কুরযওয়েইল এ ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি তুলে ধরেছেন তার রোড ম্যাপ। এই রোডম্যাপ অনুসারে আমরা ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে আগামী দশকেই হার্ডওয়্যারের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সমতুল্যতা অর্জন করবো। হয়ত সেটা হবে ত্রিমাত্রিক আনবিক কম্পিউটিং এর মাধ্যমে। আর সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেও মস্তিষ্কের সমতুল্যতা অর্জন কঠিন হবে না।

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারঃ সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি কিন্তু সরলরৈখিক- অর্থাৎ ধীরগতির। দশ বছর আগে যে গুগল কে আমরা ব্যবহার করতাম আজও অনেকটা তাই ব্যবহার করি। যদিও স্বীকার করতেই হবে আজকের গুগলকে অনেক অনেক বেশি তথ্য বিবেচনায় নিতে হয়।

কুরযওয়েইলের ধারণা সফটওয়্যারেও ধীর নয় বরং দ্রুত গতির উন্নতি আসবে। তার যুক্তি আমরা মস্তিষ্ককে মডেলিং করা শুরু করেছি। মস্তিষ্ককে মডেলিং করা এবং এর গাণিতিক ও কম্পিউটেইশানাল মডেল তৈরির কাজ এক্সপনেনশিয়াল গতিতে এগুচ্ছে। যেমন ধরা যাক, লয়েড ওয়াটস শ্রবণ বিশ্লেষণের সাথে জড়িত মস্তিষ্কের ১৫টি অঞ্চলের মডেল তৈরি করেছেন এবং তাদের প্রয়োগ করেছেন কম্পিউটারে। অপরদিকে ম্যাশিন লারনিং এর বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে কার্নেগী মেলনের টম মিশেল মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতি বোঝার চেষ্টা করছেন। [6] মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ মডেল তৈরির কাজ শেষ হলে আমরা সেটিকে কম্পিউটারে প্রয়োগ করবো এবং তৈরি হবে মানুষের সম পর্যায়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কুরযওয়েইলের মতে ২০২৯ সালের মধ্যে ঘটতে চলেছে সেই অবিস্মরণীয় ঘটনাটি।

এখানে একটা ব্যাপার বোঝা দরকার। সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গান উপভোগ করতে পারবে না, কিন্তু গানের সুর বাঁধতে পারবে। কোন সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে না, কিন্তু সবকিছু ঠিকমত আইডেন্টিফাই করতে পারবে।

সমাজ বিজ্ঞানীঃ পৃথিবীতে ৭০০ কোটি মানুষের বাস। আর একটা মানুষের সম পর্যায়ের বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ার গুরুত্ব কোথায়? সমাজে এটা কি প্রভাব ফেলবে?


আসলে গুরুত্ব এখনেই যে, ম্যাশিন অনেক দ্রুততার সাথে চিন্তা আর হিসাব নিকাশ করতে পারে, নিখুঁত ভাবে মনে রাখতে পারে, পারে প্রচন্ড গতিতে জ্ঞান আদান প্রদান করতে। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, কুরযওয়েইলের মতে অজৈব বুদ্ধিমত্তা (Non-biological Intelligence) প্রতি বছর দ্বিগুণ হারে শক্তিশালী হবে। এরপর মানব মস্তিস্ক এবং কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হবে আর তখন মানুষ পুরোপুরি ভাবে হয়ে উঠবে সাইবর্গ।

মানব বুদ্ধিমত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সেই বিপুল শক্তি তখন মহাবিশ্ব জয়ে বেরিয়ে পড়বে। শুধু মহাবিশ্ব জয় নয়, বরং মহাবিশ্বের বস্তুকনাগুলোকে বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটেশানের কাজে ব্যবহার করবে এবং আমরা ধাবিত হব বিবর্তনের শেষ পর্যায়ে।

এরপর? এরপর কি হবে তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব দেওয়া যাক পাঠক তোমাকেই! এই মহাবিশ্বে তো তোমারও অংশিদারিত্ব আছে, নাকি?


                                        Ray Kurzweil

রেফরেন্সঃ

  1. Kurzweil Accelerating Intelligence
  2. Vernor Vinge
  3. The Singularity Is Near: When Humans Transcend Biology
  4. Moore’s Law
  5. Stem Cell
  6. Tom Mitchell


লেখাটা ২০০৮ এর। ২০১৪ তে প্রযুক্তি কোথায় দাঁড়িয়ে?

  • “আশেপাশের বুদ্ধিমান যন্ত্রপাতিগুলোর সাথে যখন তখন আড্ডা জুড়ে দেওয়া” 
    • – iPhone Siri. প্রথম বাজারে আসে অক্টোবর ২০১১ তে।


  • “কিংবা তোমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বেশিরভাগই হয় কৃত্রিম” 
    • – Hugh Herr এর 2014 TED Talk টি দেখুন! 


  • “দেহের ভেতর ব্যস্তভাবে ঘুরে বেড়ায় খালি চোখে দেখা যায় না এমন সব ন্যানো রোবট?”
    • পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারদের একজন MIT Prof. Robert Langer (1030+ granted or pending patents.[1][14] 1,200+ published scientific papers) এমন সব Polymer, Nano-materials develop করেন যেগুলো দেহের যে স্থানে প্রয়োজন ঠিক সেই স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেয়।
  • https://youtube.googleapis.com/v/uta5Vo86XL4&source=uds

 

    • “ভার্চুয়াল রিয়ালিটির জগতে কৃত্রিম সব অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকতেই বা কেমন লাগবে?”
      • Oculus Rift Virtual Reality Headset. Facebook March 2014 এ $2 Billion দিয়ে কিনে নিয়েছে। 2014 এর শেষদিকে অথবা 2015 এর প্রথমদিকে Market এ আসবে। 
    • Google glass (Augmented Reality) – সবার সামনে আসে ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তে। তুমি আর আমি – আমরা দুইজন দুইটা Google Glass ব্যবহার করলে – আমি যা দেখছি শুনছি, তুমিও ঠিক তাই দেখতে, শুনতে পাবে!

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s