শিক্ষা খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনার রূপরেখা

শিক্ষা খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনার রূপরেখা

 
বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা
  • বাংলাদেশে বিশ্বমানের কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হবে। 
    • দেশে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়ে, বিনিয়োগ নিশ্চিত করে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে PhD ডিগ্রি প্রাপ্তদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
    • BUET এবং DU কে এখনই বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পরিবর্তনের হাওয়া লাগলে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ছড়িয়ে পড়বে। একে একে CUET, MIST, NSU, CU, SUST, RU, KUET, RUET, KU এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো Ranking এ উপরের দিকে উঠে আসবে। ঠিক যেভাবে ICPC কিংবা TopCoder Ranking এ আমরা শীর্ষস্থানগুলো দখল করছি। 
    • বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সত্যিকারের গবেষণা শুরু হবে – বরাদ্দ বাড়বে, গবেষণা সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা হবে। ফ্যাকাল্টি মেম্বাররা শুধুমাত্র পদোন্নতি পাওয়ার জন্য নয়, বরং ইন্ডাস্ট্রির কোন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে, নতুন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গবেষণা করবেন, পেপার পাব্লিশ করবেন।
    • বিশ্ববিদ্যালয় – ইন্ডাস্ট্রি এর মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলা হবে। 
      • ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা হবে।
      • প্রোডাক্ট ডেভেলাপমেন্ট এবং রিসার্চে বিশ্ববিদ্যালয় – ইন্ডাস্ট্রি একসাথে কাজ করবে। 
      • কোন শিক্ষার্থীর প্রজেক্ট হয়ে উঠবে আরেকটি ইন্ডাস্ট্রির প্রোডাক্ট। 
      • ফ্যাকাল্টি মেম্বাররা প্রোডাক্ট ডেভেলাপমেন্ট এবং রিসার্চে ইন্ডাস্ট্রির কাছে ফান্ডিং এর আবেদন করবেন। 
    • প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং এদের শাখাগুলোর অনুমতি প্রদানে স্বচ্ছতা আনা হবে – ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা হবে।
  • বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন রাঙ্কিং প্রথা প্রবর্তিত হবে। 
    • রাঙ্কিং প্রথায় বিভিন্ন objective measures ব্যবহার করা হবে – যেগুলো নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। জার্নালে এবং কনফারেন্সে পেপার পাব্লিকেশানের উপর এত পয়েন্টস, পেপারের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের উপর এত, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্যের উপর এত, পাশ করার ৩ মাসের মধ্যে চাকরি প্রাপ্তির হারের উপর এত, শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও গবেষণা প্রোফাইলের উপর এত, ছাত্র – শিক্ষক অনুপাতের উপর এত পয়েন্টস – এরকম কিছু measures। 
    • প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের মাঝে এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে মেধাবী ছাত্র ভর্তির জন্য এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করবে – ফলশ্রুতিতে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়বে। 
    • বিষয়ভিত্তিক রাঙ্কিং প্রথা চালু করা হবে। 
    • কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ত গর্বের সাথে বলবে, জান, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ দেশ সেরা! যাকে বলা হবে সে উত্তর দেবে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ দেশ সেরা আর এশিয়ার সেরা ১০টার একটা!  
  • বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী দেশের কিশোর গণিতবিদদের কাছে যে ৩টি স্বপ্নের কথা বলেছিলেন তাদের মধ্যে ছিল ২০২২ সালের মধ্যে একজন বাংলাদেশী গনিতবিদের ফিল্ডস মেডল জয় এবং ২০৩০ সালের মধ্যে একজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর নোবেল পুরষ্কার জয়। নাগরিক শক্তি ২০৩০ সালের মধ্যে ফিল্ডস মেডেল এবং নোবেল পুরস্কার জয়ের লক্ষ্যে গবেষণা সংস্কৃতিতে নতুন জাগরণ এবং বিশ্বমানের গবেষণা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করবে।
  • উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম যাতে অপরাজনীতির কারণে বাঁধাগ্রস্থ না হয়, দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্থ (যেমন নিয়োগে অনিয়ম) না হয়, সে ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 
    • সেশন জটের কারণগুলো চিহ্নিত করে দূর করা হবে। আন্ডারগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীরা ৪ বছরে বাচেলারস ডিগ্রী শেষ করবে। 
    • আমরা শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ রাজনীতির চর্চা, উদ্ভাবনী উদ্যোগ দেখতে চাই – ছাত্রছাত্রীরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে দল বেঁধে কাজ করবে।
  • দেশের যেসব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নেই, সেসব জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে।যেগুলো আছে ওগুলোর আসন সংখ্যা বাড়ানো হবে। 
    • সুযোগ দিলে অনেকেই সর্বোচ্চ চেষ্টার মাধ্যমে “কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে ভাল চাকরি” করতে চাইবে। কিছু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি শুধুমাত্র এইচএসসি বা সমমানের শিক্ষার্থীদের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এটাই একমাত্র উপায় – অনেকে একটু বড় হওয়ার পর বুঝতে পারে!


 
 

শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন 

  • শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটা মানুষের মাঝে লুকিয়ে আছে বিশাল সুপ্ত ক্ষমতা। শিক্ষার মাধ্যমে প্রত্যেকে তার সুপ্ত ক্ষমতাকে জাগিয়ে তুলে এক একটা বিশাল শক্তি হয়ে উঠতে পারে। জ্ঞান আর মেধা দিয়ে জীবনে সবকিছু অর্জন করা যায়। যে কেউ প্রায় যে কোন বয়সে সঠিকভাবে চেষ্টা করলে যে কোন কিছু হয়ে উঠতে পারে – এই বিশ্বাসটা সবার মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে। মানুষগুলোকে জাগিয়ে তুলতে পারলে আর কিছু লাগবে না। এক একটা মানুষ যেখানে বিশাল শক্তি হতে পারে সেখানে ১৬ কোটি মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পারলে আমাদের আর পিছে ফিরে তাকাতে হবে না। 
    • শিক্ষা শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না, আমরা চাইলে জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে চারপাশ থেকে শিখতে পারি। 
    • ইতিহাসের যে কোন সময়ের তুলনায় নিজেকে উপরে তোলার সুযোগও সবচেয়ে বেশি আমাদের প্রজন্মের। আধুনিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আমাদের হাতে দিয়েছে অনন্য সব আবিষ্কার – মানুষ এখন যে কোন প্রান্তে বসে যে কোন কিছু শিখতে পারে, যে কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারে, কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, কাজ করতে পারে, পারে আয় রোজগার করতে।
  • বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
  • শিক্ষাবিদদের নিয়ে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে। কমিশনের পরামর্শের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী – অভিভাবকদের মতামত নিয়ে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাবাবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে আমূল সংস্কার আনা হবে। 
  • সৃজনশীল এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ নির্ভর শিক্ষা বাবস্থা চালু। 
    • বই থেকে শেখা জ্ঞান দিয়ে জগতটাকে দেখতে শেখানো। 
    • “লার্নিং বাই ডুইং” (হাতে কলমে শিক্ষা) চালু করা হবে। এতে বইয়ের জগত এবং বাস্তব জীবনের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি হবে। 
  • শিক্ষার্থীরা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেরা শিখবে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে শিখবে।
  • তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকৌশলী থেকে শুরু করে কৃষক পর্যন্ত সবার জন্য “লাইফলং লার্নিং” (জীবন ব্যাপী শিক্ষা) এর সুযোগ।
 
 
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা
  • দেশের প্রত্যেকটা স্কুলে আধুনিক লাইব্রেরি গড়ে তোলা হবে। 
    • লাইব্রেরিগুলো হবে জ্ঞান চর্চা ও জ্ঞান আদানপ্রদানের কেন্দ্র। 
    • বই, উচ্চগতির ইন্টারনেটসহ কম্পিউটার এবং কিছু যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হবে। 
    • স্কুল লাইব্রেরিগুলো সবসময় খোলা থাকবে। শিক্ষার্থীরা যতক্ষণ খুশি লাইব্রেরিতে সময় কাটাতে পারবে। 
  • সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পাঠ্যসূচীতে পরিবর্তন। নৈতিকতার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • পরীক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সংস্কার আনা হবে।
  • শিক্ষার্থীরা মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। বিভিন্ন অলিম্পিয়াড, প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য উদ্যোগের মাধ্যমে মেধাবী জাতি গড়ে তোলা হবে। 
    • ছাত্র – ছাত্রী, কিশোরকিশোরী, তরুণ-বৃদ্ধ সবাই অবসরে ধাধার সমস্যার সমাধান করবে। মেধা-বুদ্ধি শানিত করবে। সূচনা হবে নতুন সংস্কৃতির। প্রত্যেকে হয়ে উঠবেন চিন্তাশীল, মেধাবী, বুদ্ধিমান।  
    • গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত গণিত অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান প্রকল্প এর সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া হবে।


 
 

মাদ্রাসা শিক্ষা  

  • মাদ্রাসা শিক্ষাবাবস্থার সংস্কার – আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্তিকরন – যাতে মাদ্রাসা শিক্ষাবাবস্থায় শিক্ষিতরা মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, বাবসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও বেশি সুযোগ পায়।
 
 
শিক্ষা নিয়ে আরও
 
 
তোমাদের জন্য লেখা
 
 
শিক্ষাবিদরা কি ভাবছেন


– ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা; উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক; সভাপতি, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।



তরুণ প্রজন্ম এখন নেতৃত্ব নিতে সক্ষম
শিক্ষার্থীরাই দেশের সম্পদ
– ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বিভাগীয় প্রধান, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 


“আজ থেকে ৫০ বছর আগে পৃথিবীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যদি র‌্যাংকিং করা হতো, নিশ্চয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানজনক তালিকায় থাকত। কিন্তু এখন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। তাতে আমাদের চৈতন্যোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে হবে, সে কথা কিন্তু শিক্ষাবিদেরা সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত প্রতিটি ওয়ার্ল্ড ক্লাস ইউনিভার্সিটি কনফারেন্সে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।”

দুষ্টচক্রে আবদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা part-2
ভর্তি, মান ও দক্ষ জনশক্তি

– ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

 
 
 
শিক্ষায় বাংলাদেশী উদ্যোগ 

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s