বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াডের সংস্কৃতি

বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াডের সংস্কৃতির সূচনার পর বেশকিছু ব্যাপার আমরা লক্ষ্য করছি।

আমরা লক্ষ্য করছি, অনেকগুলো ছেলেমেয়ে রাতদিন গণিত করে।

স্কুল কলেজে আমরা গণিত বলতে exercise করি – কিছু নির্দিষ্ট ধাপ বা কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভাষায় অ্যালগরিদম মেনে চলি মাত্র। কিন্তু গণিত অলিম্পিয়াডের সমস্যাগুলো সমাধানে ধাপগুলো বা অ্যালগরিদম নিজেকে দাঁড় করাতে হয়। অন্যকথায়, গণিত সৃষ্টি করতে হয়।

একটা উদাহরণ দেই। দুটা সংখ্যাকে গুণ করতে আমরা না বুঝেই কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলি – প্রথমে দুটি সংখ্যার সবচেয়ে ডানের অঙ্ক দুটিকে গুণ করি, তারপর হাতে রাখি ইত্যাদি। কিন্তু গণিত অলিম্পিয়াডে এই ধাপ বা নিয়মগুলো – কোন ধাপের পর কোন ধাপ হবে – তা নিজেকে চিন্তা করে বের করতে হয় – অর্থাৎ গণিত সৃষ্টি করতে হয়। আমরা বলি, স্কুল কলেজে তোমরা exercise কর, আর আমরা গণিত অলিম্পিয়াডে problem solve করি। কাজেই এখনও যারা Problem Solving কর না, আশা করি, তোমরাও দ্রুত আমাদের দলে যোগ দেবে!

একটা প্রজন্ম গড়ে উঠছে যাদের গড় IQ আগের প্রজন্ম গুলোর তুলনায় বেশি। অনেকগুলো ছেলেমেয়ে আগের চেয়ে ভালভাবে চিন্তা করতে পারে। আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক এ নিজের ছবি দেখা; বিশ্ব প্রতিযোগিতায় নিজ দেশকে represent করা – অনেক বড় inspiration

আমরা লক্ষ্য করেছি, গণিত অলিম্পিয়াডের অনুষ্ঠানগুলোতে অনেক ভাল ভাল কথা হয়। আলোকিত মানুষ হওয়ার, দেশকে ভালবাসার অনুপ্রেরণা পায় ছেলেমেয়েরা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দেশের গুণী মানুষদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়, প্রশ্ন করতে পারে, কথা বলতে পারে এবং অটোগ্রাফও নিতে পারে!

দুটা চমৎকার ব্যাপারের একটা হল “গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো” – অনেকগুলো ছেলেমেয়ে নিজের জীবন নিয়ে দেশ নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখছে। আরেকটা হল একেবারে ক্লাস থ্রি – ফোরের ছেলেমেয়েরা ড. জাফর ইকবালের ভাষায় “পেন্সিল কামড়ে” অঙ্ক করতে আসে!

আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলা মাধ্যমের বেশ কিছু ছেলেমেয়ে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেল এ পড়ার সুযোগ পেয়েছে। মুন পড়ছে Harvard University তে [1], নাজিয়া MIT তে [2] (নাহলে “MIghTy” শব্দটা এভাবে লেখা আমাদের শেখা হত না!), ইশফাক Stanford University তে [3], তানভির Caltech এ [4] (আমাদের শ্রদ্ধেয় ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই বিশ্ববিদ্যালয়ে Post-Doctoral Researcher হিসেবে কর্মরত ছিলেন) [5], সামিন Cambridge University তে [6]।
আগে গ্রাজুয়েট স্কুলগুলোতে আমরা এমএস বা পিএইচডি করতে যেতাম। ইংরেজি মাধ্যমের অবস্থাসম্পন্ন ছেলেমেয়েরা পড়তে পারত আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলে। কিন্তু “বাংলা মাধ্যম” থেকে “স্কলারশিপ নিয়ে” “আন্ডার গ্রাজুয়েট” লেভেলে “বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে” পড়তে যাওয়াটা নতুন!

“বাংলা মাধ্যম” থেকে “স্কলারশিপ নিয়ে” “আন্ডার গ্রাজুয়েট” লেভেলে “বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে” পড়ার পথ দেখানোর কৃতিত্বের একক দাবিদার বাংলাদেশ গণিত দলের কোচ ড. মাহবুব মজুমদার  [7]; যিনি নিজে MIT থেকে Electrical Engineering এ আন্ডারগ্রাড, Stanford University থেকে Civil Engineering এ মাস্টার্স এবং Cambridge University থেকে Theoretical PhysicsPhD করে Imperial College এ [8] Post Doctoral করছিলেন। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশে থেকে যান। বিদেশী ও ইঞ্জিনিয়ারিং আন্ডারগ্রাড ডিগ্রি থাকা এবং আরও কিছু হাস্যকর কারণ দেখিয়ে তাকে Dhaka UniversityPhysics Department এ যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। [9] তিনি স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশে একটা বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। তার মত ভাল মানুষ সচরাচর দেখা যায় না। আমরা তার পাশে থাকবো।

১৯০৫ এ আইনস্টাইনের “Miracle Year” [10] স্মরণে ২০০৫ সালের বাংলাদেশ জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে আইনস্টাইন এবং পদার্থবিজ্ঞানের উপর একটা প্রশ্ন উত্তর পর্ব ছিল। সেখানে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলাম। তাই গণিত ক্যাম্পে ড. মাহবুব মজুমদার আগ্রহের সাথে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতেন। মেক্সিকোতে যাওয়ার আগে প্রেস কনফারেন্সে দেখি তিনি স্ট্রিং থিউরি (String Theory) র [11]  একটা জটিল পেপার নিয়ে হাজির!
  
আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মত। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে আমাদের সাফল্যের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। আমাদের কিশোর – তরুণ গণিতবিদরা ২০০৬ সালে প্রথমবারের মত অনারেবাল মেনশান, ২০০৯ সালে প্রথমবারের মত ব্রোঞ্জ মেডাল, ২০১২ সালে প্রথমবারের মত সিলভার মেডাল জয় করে এনেছে। আমরা আশা করছি, এই ধারা অব্যাহত রেখে বাংলাদেশ গণিত দল ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড থেকে গোল্ড মেডাল নিয়ে ফিরবে! গোল্ড মেডাল জয়ী সেই গণিতবিদ হতে পারো তুমিই!  

গণিত অলিম্পিয়াডের এই সংস্কৃতি সম্ভব হয়েছে কিছু তরুণ – তরুণীর স্বেচ্ছা কর্মোদ্যোগে। আমরা তাদের “মুভারস” (MOVERS – Math Olympiad Volunteers) বলে জানি। একটা শুভ উদ্যোগে দেশের তরুণ তরুণীদের উৎসাহী অংশগ্রহণ আমাদের প্রাণশক্তিতে ভরপুর তরুণ প্রজন্মকে সংজ্ঞায়িত করে।

নাগরিক শক্তি গণিত অলিম্পিয়াডের এই সংস্কৃতিকে দেশে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেবে।