মায়ানদের মায়াময় জগতে একদিন

#StoriesOfMyLife

২০০৫ সালে বাংলাদেশ গণিত দল আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে প্রথমবারের মত অংশগ্রহণ করে।
মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ গণিত দলের সদস্য ছিল ৬ জন। আমি ছাড়া বাকিদের মাঝে মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান শান্ত বুয়েট থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করে বর্তমানে একই বিভাগে লেকচারার হিসেবে কর্মরত, শাহরিয়ার রউফ নাফি বুয়েট থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করে বর্তমানে গুগলে (Google, Inc.) কর্মরত, তাহমিদ উল ইসলাম রাফি বুয়েট থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে স্নাতক শেষ করে বর্তমানে দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুলে কর্মরত, রাফাতুল ফারিয়া বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক শেষ করে বর্তমানে Purdue University তে পিএইচডি করছে, সাবরিনা তাবাসসুম আইবিএ থেকে বিবিএ করে বর্তমানে University of Queensland এ  International Economics and Finance এ মাস্টার্স করছে।
আমাদের টীম লিডারের দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সহ‌-সভাপতি ডঃ মুনিবুর রহমান  চৌধুরী এবং ডেপুটি টীম লিডার হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান।  

লেখাটা ২০০৫ সালে মেক্সিকো থেকে ফিরে এসে লেখা।
জুলাই ১৫ তারিখের বর্ণনা। সামান্য পরিমার্জিত।
আইএমও (IMO – International Mathematical Olympiad) তে অংশগ্রহণের শুরুটা হয়েছিল বেশ চমৎকারভাবেই।
ঢাকার শেরাটনে আমাদের প্রেস কনফারেন্স শেষে বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম আমি আর নাফি।
কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে আগ্রহের সাথে জানতে চাইলেন মেক্সিকোতে কারা কারা যাচ্ছে?
নাফি আমাকে দেখিয়ে দিল – ও যাচ্ছে!
মুখ ভরা হাসি নিয়ে আমি নাফিকে দেখিয়ে দিলাম – ও ও যাচ্ছে!
ভদ্রলোক আমাদের দিকে এতটা বিস্ময় ভরা চোখে তাকালেন যে, বুঝতে অসুবিধা হল না ব্যাপারটার মাঝে যে কৌতুককর অংশ আছে তা এই বিস্ময়ের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে!

জুলাই এর ১৩ আর ১৪ তারিখ ২ দিনের পরীক্ষা দিয়ে আমরা যখন খানিকটা ক্লান্ত, তখন ১৫ তারিখ থেকে শুরু হল বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা আর একটা দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস আর ঐতিহ্য কে উপলব্ধি করার পালা, আইএমওর যেটা অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গণিতকে শুধুমাত্র পরীক্ষার হলে সীমাবদ্ধ না রেখে আমরা যখনই পেরেছি, আশে পাশের সবকিছুকেই গাণিতিক কাঠামোয় আনার চেষ্টা করেছি।

গণিতের এই উৎসবে বিভিন্ন রিসোর্সের অপ্টিমাম ব্যবহার হচ্ছে না দেখে নাফি তো রীতি মত হতাশ!

তবে আমাদের মাঝে গণিত সচেতনতার পাশাপাশি রূপ সচেতনতাও যে ভালই কাজ করে তা বোঝা গেলো ১৫ তারিখ সকালে!

সানব্লক ক্রিম নিয়ে রীতিমত কাড়াকাড়ি পড়ে গেলো! “আমরা হারিয়ে ফেলব” ধরণের অজুহাত দিয়ে মাহবুব ওটা ওর কাছেই রাখবে! ভাগ্যিস কোন বিজ্ঞাপন নির্মাতা কাছে পিছে ছিলেন না। থাকলে নির্ঘাত সানব্লক ক্রিমের একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করে ফেলতেন!

মোট ১৬ টা বাস করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল যিবিল চালতুনে [1]। মায়া সভ্যতার অসাধারণ একটা নিদর্শন এটা। খ্রিষ্ট পূর্ব ১০০০ থেকে খ্রিস্টাব্দ ১৫২৬ পর্যন্ত মায়ানদের দেশ ছিল মেক্সিকো। প্রায় ২০ বর্গ কিলোমিটার জায়গার উপর ৮৪০০টা ছোট বড় কাঠামো নিয়ে এই নিদর্শন। মূল আকর্ষণ – টেম্পল অফ সেভেন ডলস। বেশ উঁচু একটা মন্দির এটা। সিড়ি দিয়ে উঠতে হয়। মাঝেখানে বড় সড় একটা ফাঁকা জায়গা আছে যাতে মন্দিরের একপাশে দাঁড়িয়ে অন্যপাশে আকাশ দেখা যায়। ২১ মার্চ আর ২২ সেপ্টেম্বর সূর্য এমন অবস্থানে আসে যে, ফাঁকা জায়গা দিয়ে সূর্য দেখা যায়। মায়ানদের বছরও ছিল সৌরকেন্দ্রিক – ২৬০ দিনের। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাদের দক্ষতা এসব থেকে স্পষ্ট।

কাছে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড নদীও আছে। দেখতে অবশ্য পুকুরের মত, তবে নিচ দিয়ে সাগরের সাথে যুক্ত।

পুরো এলাকাটা ঘুরে দেখার চাইতে ছবি তোলায়, ভিডিও করায় আমাদের উৎসাহ ছিল বেশি।

সময় হলে আমরা নিজ নিজ বাসে ফিরে এলাম (মোট বাস ১৬টা)।

আমাদের বাসে ছিল – Australian Math Team, Argentine Math Team, Belgian Math Team, Bosnia and Herzegovinian Math Team সহ আরও কয়েকটা Team.

আচ্ছা, বলতো দেখি – এই দেশগুলোর বিশেষত্ব কি? আমাদের সাথে একই বাসে কেন?

ঠিকই ধরেছ!

Bangladesh B দিয়ে, কাজেই Alphabetic Order maintain করে Management করা হলে – Australia, Argentina, Belgium, Bosnia and Herzegovina এসব দেশ – বাংলাদেশের সাথেই থাকার কথা!

খানিকক্ষণের এই বাসেও আনন্দকে বিরতি দিতে আমাদের প্রবল আপত্তি!

বল ছোড়াছোড়ি নিয়ে বিচিত্র এক রকম খেলা শুরু হল। আরজেন্টাইন এক কন্টেস্টেন্ট মূল খেলোয়াড়, দুষ্টুমিতেও সে এগিয়ে। বল কখনও গিয়ে পড়ল কোন মেয়ের গায়ে। সে দেখিয়ে দিল, বেলজিয়ান, বেলজিয়ানরাই এজন্য দায়ি! আবার কখনও বল চলে গেলো ড্রাইভারের কাছে। এবার সে বলল, বসনিয়ানরাই যত নষ্টের মূল!

বাস আমাদের নিয়ে এলো প্রগ্রেসো বীচে।

তখন দুপুর হয়ে এসেছে। সূর্য মধ্য গগণে। সূর্যের এই প্রখর আলোয় গালফ অফ মেক্সিকোর অপূর্ব সৌন্দর্য আমাদের মন ভরিয়ে দিল। কাছে হালকা নীল। দৃষ্টি আরেকটু প্রসারিত করলে নীল যেন খানিকটা ঘন হয়ে আসে। আরও দূরে একেবারে গাঢ় গভীর নীল – সাগরের এই রূপ থেকে চোখ ফেরানোই কঠিন। সমস্যা হচ্ছে কবি লেখক দের দেখার চোখ আমার নেই। কাটখোট্টা একটা চশমার ফ্রেমের পেছনে চোখ রেখে যতদূর দেখা যায় – তাই দেখি!

সাঁতার না জানলেও আটলান্টিক মহাসাগরের পানিতে গা ভেজানোর সুযোগ ছাড়তে আমরা কেউই রাজি না। এদিন আমরা বেশ হৈ চৈ করেছি!

তীরের বেলাভূমিতে কেউ ফুটবল, কেউবা ভলিবল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একপাশে দেখা গেলো একটা ছেলে চিত হয়ে শুয়ে পড়েছে আর তার উপর শুধু বালি দিয়ে কয়েকজন মিলে নারীর একটা প্রতিকৃতি তৈরির চেষ্টা করছে। প্রতিকৃতিটা শেষ পর্যন্ত এত অদ্ভুত হয়ে দাঁড়ালো যে আমাদের স্বীকার করতেই হল – শিল্প চর্চার জন্য বেলাভূমিই উপযুক্ত স্থান!

বেলাভূমির পাশেই উঁচু জায়গায় একটা রেস্টুরেন্ট আর তার পাশে কয়েকটা সুইমিং পুল। সেখানেও আনন্দের কমতি নেই। কয়েকজন মিলে একেক জনকে শূন্যে তুলে ধরে পানিতে ছুড়ে ফেলছে!

হোটেলে ফেরার পথে আমরা আমাদের মেক্সিকান গাইড অ্যানাকে বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা কিছু জানানোর ফাঁকে জাতীয় ফুল, ফল, মাছ, পাখি এসবও চিনিয়ে দিলাম। মেক্সিকোতে এতরকম “জাতীয়” ব্যাপার সাপার নেই বলে এসব তথ্য তার কাছে অদ্ভুত ঠেকল। আমাদের জাতীয় সবজি, জাতীয় ডিশ নেই কেন এই প্রশ্ন করে আমাদের হয়রান করে তুলল!

এক সময় বাস পৌঁছে গেলো আমাদের নতুন অস্থায়ী ঠিকানা – হোটেল ফিয়েস্তা অ্যামেরিকানায়।

এত চমৎকার একটা দিন শেষ হয়ে এলেও আমাদের মাঝে বিষাদের কোন রেখা দেখা গেলো না।

না জানি আরও কত নতুন অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে!

চিচেন ইটযার সামনে আমি

বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড নিয়ে আরও

References